অনুপ্রেরণা বা আবেশ যা ই হোক না কেনো লিখে চলেছি তার ডাকে। যখন স্কুলে পরতাম, একটা
দুটো wall magazine এ লিখতাম। প্রথম লেখার প্রকাশ মনন এ…মূলত ছোটো গল্প লিখি। কবিতাও
লিখি মনের ই আবেশে । নিজের জীবনের সাথে ভাবের তরঙ্গ মিশিয়ে সৃষ্টি করি কাগজ ও কলমের
হৈ চৈ। মনের কোণে নিজের কলমে আমি একেবারেই নবাগতা । এখানে এসে ভালো লাগলো এটা দেখে
যে সবাই এখানে এক সঙ্গবদ্ধ সাহিত্য চর্চায় মগ্ন ।
মনের কোণে নিজের কলম তার স্বকীয়তায় এগিয়ে যাবে এই আশা রাখি ।
::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
ঢেউ ভেসে যায়
চোখের পাতায়
ঢেউ যেমন আন্দোলনের উন্মাদনা আনে সমুদ্রের বুকে, তেমনই এক উন্মাদনা হয়তো চেয়েছিল
তৃষা । বড় রঙহীন ছিল তার জীবন । বাড়িতে অসুস্থ মায়ের সেবা আর অফিসের ব্যস্ততা, এই ছিল
তৃষার নিত্য দিনের একঘেয়ে কর্মসূচি । তৃষার বাবা নেই । গত হয়েছেন বছর আষ্টেক । হয়তো
সে চেয়েছিল কিছু রঙের আবেশ । তাই হঠাৎই এক ঘটনা ঘটে গেল উপরওয়ালার কলকাঠিতে ।
হঠাৎ করে একদিন অনলাইন বন্ধুত্বের ডাক পেল তৃষা কোনো এক অতিন্দ্র্ম ব্যানার্জীর
কাছ থেকে । তৃষা তাকে না চিনলেও অতিন্দ্র্ম তাকে চিনতো ! তাদের ছোটবেলার সেই মফস্বল
শহর থেকেই । সাধারনত কোনো অপরিচিত কারুর কাছ থেকে কোনো বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে
না সে। যেহেতু অতিন্দ্র্ম তাকে চিনতো সেই কিশোরকাল থেকেই, আর জানত তৃষার সম্বন্ধে অনেক
ছোটো ছোট কথা যেমন সে কোথায় থাকত, কোন স্কুলে পরত, কোথায় কোথায় সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াত,
এমন কি তার বন্ধু বান্ধব দের পর্যন্ত। এই সব শুনে তৃষা বেশ খানিকটা আবেশের বসেই গ্রহণ
করে অতিন্দ্র্মের বন্ধুত্ব । দু তিন দিনের মধ্যেই অতিন্দ্রমের সাথে অনলাইন আড্ডায় তৃষার
তাকে বেশ চিত্তাকর্ষক মনে হতে লাগল, কারণ তাদের আড্ডার বেশিরভাগটাই জুড়ে থাকত তাদের
ছেলেবেলার সেই ছোট্ট মফস্বল শহর । আর সেই শহরের আর তার স্কুল জীবনের ছোট ছোট গল্প ।
কোথায় যেন এক আলেখ্য পিছু টানে তারা বাঁধা পরে যেতে লাগলো । আজ বহুবছর বাদে যদিও তারা
কলকাতায় যে যার নিজের কর্মসুত্রে ব্যাস্ত, তবু যেন ছোট বেলার সেই সবুজ শহর আবার নতুন
করে সজীব হয়ে ওঠে তাদের মধ্যে। একদিন কথার মাঝে অতিন্দ্রম, তৃষাকে তার অফিসে আসার আমন্ত্রণ
জানায় । তৃষার মধ্যেও ছিলো তাকে দেখার এক অদম্য ইচ্ছে। ক্রমে ক্রমে দুঃসাহসী হয়ে ওঠে
সে । খানিকটা রোমাঞ্চ আর মজার জন্যই সে ঠিক করে, দেখা করবে অতিন্দ্র্মের সাথে। মনের
মধ্যে ভয়ের ভাবকে একেবারে ঝেড়ে ফেলে অফিস থেকে ফেরার পথেই একদিন বাস থেকে নেমে পরে
অতিন্দ্র্মের অফিসের কাছে। উত্তেজনায় তখন তৃষার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাবার যোগার, তবুও
সাহস করে ফোন করে অতিন্দ্র্মকে জানায় যে, “সে অপেক্ষারত। অতিন্দ্রম তখন সবে অফিস থেকে
বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে । তৃষার ফোন যেন একটা ঝড় তুলে গেল তার মনে। তরিঘরি পাঁচ মিনিটের
মধ্যে পৌছল তৃষার কাছে। প্রথমত সে তৃষাকে দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলনা, স্বপ্ন কিনা
। বার তিনেক নিজেকে চিমটিও কাটে সে। তারপর গাড়ির দরজা খুলে দেয় । তৃষা গাড়িতে উঠে বসে
। দুজনের বুকের মধ্যেই তখন যেন হামান দিস্তে পিষে চলেছে অবিরাম। খানিকটা গুছিয়ে বসার
পর তৃষা লক্ষ্য করে, গাড়ির এয়ার কন্ডিশন চলা সত্তেও, অতিন্দ্র্মের কানের পাশ থেকে ঘাম
চুইয়ে পড়ছে উত্তেজনায়। মনে মনে খানিকটা আস্বস্থ
হলো তৃষা, যাক, ছেলেটা অন্তত বিপদজ্জনক নয়, বন্ধুত্বের জন্য। শুধু বন্ধুত্বের কথাই
তখন মাথায় এসেছিল তৃষার । ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে গন্তব্য স্থল এসে পরে, গাড়ি থেকে নেমে
যায় তৃষা । তৃষা চলে যাবার পর গাড়িটাকে রাস্তার এক পাশে দাড় করায় অতিন্দ্রম। আনমনে
একটা সিগারেট ধরায়, ভাবে তৃষা যেন ঠিক ঝড়ের মতন উথাল পাথাল করে গেল তাকে । তৃষা কিন্তু
ভুলেই যেত অতিন্দ্রমকে, যদি না তার ফোনে মাঝে মধ্যে কিছু SMS আসত: যেমন, “আমায় ভুলে
গেলি নাকি রে” অথবা Dying for a chat with you”, “সকাল সকাল ভীসন মন খারাপ রে”, “অনলাইন
আসবি PLEASE”, ইত্যাদি ইত্যাদি । ধীরে ধীরে এক আবেশে দ্রবীভূত হতে থাকে তৃষা আর অতিন্দ্রম
। ইতিমধ্যে অতিন্দ্রম বদলি হয়ে আসে কলকাতা থেকে দিল্লী অফিসে । কলকাতার অফিস পলিটিক্স
থকে রেহাই পেয়ে একদিকে যেমন হাফ ছেড়ে বাঁচলো অতিন্দ্রম, তেমনি আত্মীয়, বন্ধু বান্ধব
ছেড়ে দিল্লী এসে যে গভীর একাকিত্বে ডুবে গেছিল সে, আর তার থেকে রেহাই পেতে সে হাত বাড়ায়,
তৃষার দিকে। মিশে যেতে লাগল দুজনের তরঙ্গ, বাজল এক ভালোলাগার সুর, আর সেই সুর ধীরে
ধীরে গভীর হতে লাগলো ভালবাসার আবেশে। দিনের শেষে অফিসে সব ব্যস্ততা কাটিয়ে অতিন্দ্রমের
মন ছুটে যেত তৃষার কাছে, অন্তত তার গলাটা যেন শুনতে পায় একবার । এত প্রাণ ছিল তৃষার
কন্ঠস্বরে, যে সারা দিনের পরিশ্রম নিমেষে দূর হয়ে যেত। আর সেই সময় তৃষাও তার বাড়িতে
অসুস্থ মায়ের সেবায় ব্যাস্ত । তারই মাঝে ফাঁকে ফোকরে চলত তাদের কথোপকথন । তৃষা আর অতিন্দ্রম
সারাদিনের চরম ব্যস্ততার মধ্যেও অপেক্ষা করে থাকত শুধু এই সময়টার জন্য । প্রতিদিন রাত
৯ টা থেকে ৯:৩০ এর মধ্যে তৃষার ফোনে কড়া নাড়তো অতিন্দ্রমের SMS, কোনো দিন তৃষার মিষ্টি
গলা শোনার তাগিদে, কখনো বা কুশল বার্তা জানিয়ে । প্রথম দিকে তেমন কিছু অনুভব না করলেও
আস্তে আস্তে তৃষা বুঝতে পারে, রাত ন'টার পারে সে যেন SMS এর অপেক্ষাতেই বসে আছে । কিসের
এক নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে পরেছে তৃষা, তা সে নিজেই বুঝতে পারছিলনা । সেদিন সারাদিনে অতিন্দ্রমের
থেকে না এসেছে কোনো ফোন, না এসেছে SMS. থাকতে
না পেরে তৃষা একটা SMS-JOKES পাঠায়। উত্তরটা এলো বটে, তবে অন্য দিনের মতো ফোন করতে
চওয়ার অনুমতি বা ফোন এল না । অহরহ অশান্তি হতে লাগলো তৃষার মনে। কিন্তু সব ফেলে নিজের
আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে অতিন্দ্রমকে যে ফোন করবে এমনও সে নয়। হঠাৎ রাতে খুড়তুত ভাইয়ের
ডাকে কম্পিউটার খোলার সুযোগ ঘটে গেল তৃষার। সুযোগ বুঝে অনলাইন হতেই অতিন্দ্রমের অভার্থনা:
Am I Dreaming..! আজ অফিস থেকে ফেরার পথে সারা রাস্তা ভাগবানের কাছে প্রার্থনা করেছি,
রাতে যেন তোকে অনলাইন-এ পাই” । রাত ১২ টাতে তৃষা কোনদিনও অনলাইন হয় না, আজ যেন কোনএক
আবেশে ১৫০০ মাইল ব্যবধানে থেকেও দুজনে-দুজনের মনের কথা প্রকাশ করতে করতে মুছে গেল সব
বাব্যধান । মিশে গেল তারা সব সীমাহীন। উত্তরে তৃষা জানায়,
তাহলে তোর টেলিপ্যাথির জোর আমায় টেনে এনেছে, বল”!!!
তার মানে তুই স্বীকার করছিস তৃষা, যে আমার টেলিপ্যাথির জোর আছে…!
তা আছে বটে…!
একটা কথা বলবি তৃষা, খুব জানতে ইচ্ছে করছে!
কি....!!!
নাঃ থাক এখন। তুই শুনলে রেগে যাবি ...
না, রাগবো না, Promise: বল আগে, Please!!!
অতিন্দ্রমের মনের বাঁধ ভেঙ্গে সব কথা বেরিয়ে এল । তৃষার মতই তারও অবস্থা । সারাদিনে
অন্তত একবার তৃষার গলা শুনতে না পেলে দিনটাই যেন সম্পুর্ন হয় না তার । মাথা ভার হয়ে
থাকে। মেজাজ থাকে তিরিক্ষি। তৃষা জানত যে, রাতে কিছুক্ষনের জন্যে হলেও অতিন্দ্রম অনলাইন-এ
থাকে । তাই তার সাথে সামান্য কিছু আলাপচারিতার জন্যই তৃষা আজ অনলাইন-এ এসেছিল । কিন্তু
অতিন্দ্রমের আত্মসমর্পণ আজ যেন তৃষাকে দুকুল
ছাপিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। দুরন্ত এক ঝড়ো হওয়া উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তৃষার সবকিছু । অতিন্দ্রম
কখন এবং কিভাবে যেন তৃষার কাছে ভাইরাস হয়ে উঠলো । ভাইরাস যেমন কম্পিউটার কে তার অজান্তে
নিজের সমস্ত অস্তিত্ব ছড়িয়ে দেয়, ঠিক তেমনি অতিন্দ্রমও ভাইরাস হয়ে ছড়িয়ে পড়ল, তৃষার
জীবনে, তার শিরায় শিরায়, তার প্রতিটি অনুকম্পায় । এর হাত থেকে যে আর কোনো নিস্তার নেই
তা খুব ভালো করেই উপলব্ধি করছিল সে । নিজের নির্ভারতার কোনো নির্জন কোন থেকে নিজের
অজান্তেই অতিন্দ্রমকে, ভাইরাস বলে ডাকতে শুরু করলো তৃষা । একদিন তৃষার মাথায় এক দুষ্টু
বুদ্ধি আসে । সেদিন তার কাকার বাড়িতে কেউ ছিল না, আর ঘরের চাবি ছিল তৃষার কাছে । ইচ্ছে
হলো রাতে সবাই ঘুমিয়ে পরার পর সে আড্ডা মারবে অনলাইন-এ । একথা শুনে ভাইরাস তথা অতিন্দ্রম
তো আনন্দে আত্মহারা । রাত তখন ১২ টা । সবে তারা আড্ডায় বসেছে। এমন সময় ভাইরাসের মেসের
বন্ধুরা একসাথে জড়ো হয় নৈশ আড্ডায় । খানিকটা অনিচ্ছা সত্তেও তাকে অনলাইন ছেড়ে যোগ দিতে
হয় বন্ধুদের সাথে। ভাইরাস জানত যে তাদের পার্টি চলবে রাত ২:৩০ পর্যন্ত । তাই সে তৃষাকে
অনুরোধ জানায় রাত ৩ টের সময় অনলাইন-এ আসতে। একথায় তৃষা রাজি হয় না । কিন্তু নাছরবান্দা
অতিন্দ্রম তৃষাকে তার পাশে মোবাইল ফোন নিয়ে শুতে রাজি করায়, যাতে সে তার পার্টি শেষ
হওয়া মাত্রই যেন SMS করতে পারে । যথারিতি তৃষাও ঘুমিয়ে পরে মাথার পাশে ফোন নিয়ে । হঠাৎ
রাত ২:৩০ নাগাদ তৃষার ঘুম ভেঙ্গে যায় । সে দেখে একের পর এক SMS এসে ঢুকেছে ভাইরাসের।
SMS এর শব্দ এড়াতে তৃষা সাইলেন্ট" মোডে নিয়ে যায় ফোনটা । সাকুল্যে ১৪টা SMS এসেছে।
যেমন অপরিচিত SMS এর ভাষা, তেমনি তার যে কি বক্তব্য তা তৃষার বোধগম্য হয় না। বাধ্য
হয়েই সে ফোন করে ভাইরাসকে, খানিকটা রাগত সুরে ... ... ... ..
বলি, হচ্ছেটা কি, এই রাতদুপুরে লোকের ঘুম ভাঙ্গিয়ে....!!!
এত ঘুমের কি আছে!!! এত ঘুমাও কেন তুমি!!
তোর কি! আগে বল কি লিখেছিস SMS গুলোয়! গালাগালি নাকি!!!
গালাগালি!!! ভাবলি কি করে তুই! That would be the last thing of the world. জানতে
গেলে অনলাইন-এ আসতে হবে ।
দরকার নেই আমার জানার এই রাতদুপুরে। নিশ্চয় বাজে কিছু লিখেছিস ।
আয় না রে PLEASE! Just একবার ।
পারছিনা। SORRY. তুই আমায় ঘুমতে দিবি কি না !!!
উফ: এমন রাগ করিস না, যে কিছু বলার সাহস-ই পাই না আর । আচ্ছা বাবা, তুই ঘুমো
.. .. ..
পরের দিন সকালে একটা বেশ মিষ্টি আবেশ নিয়ে ঘুম ভাঙলো তৃষার। ইতালি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান,
স্প্যানিশ ইত্যাদি মোট ৭ টি আন্তর্জার্তিক ভাষাতে SMS এসেছে গত রাতে। কিন্তু SMS গুলোর
আসল বক্তব্য কি তা না জানতে পারায় মনের ভিতর একটা কাঁটার খোঁচা সবসময়ই লেগেছিল তৃষার।
যথারিতি সেদিন রাতেও সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তৃষা অনলাইন-এ বসে । প্রথমে ভাইরাস কিছুতেই রাজি
হয় না সে কি লিখেছে তা জানাতে। উল্টে সে নেশার ঝোকে কিছু ভুল কথা লিখে ফেলেছে, এবং
তার জন্য সে যে ক্ষমা প্রার্থি এই সব বলে এবং তার জন্য সে যে ক্ষমা প্রার্থি এই সব
বলে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইছিল, কিন্তু তৃষাও ছাড়বার পাত্রী নয়, শেষ অবধি ভাইরাসের কথায়
সে ট্রান্সলেটর-এ গিয়ে জানলো যে সাতটি ভিন্ন ভাষা হলেও তার আসল মর্ম হলো : I can’t
live without you. যার থেকে বড় মিথ্যে আর দুনিয়াতে হয় না । কিন্তু আবেগের বশে যখন কেউ
কাউকে এই কথা বলে তখন সেটাই হয়ে ওঠে জীবনের সবথেকে বড় সত্যি। ডুবে গেল তৃষা, ভাইরাসের
সমুদ্রে, যেন "আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে"।
পরের দিন দুজনেই মেতে ওঠে কর্ম ব্যস্ততায়। তবু প্রতি মুহুর্তেই যেন দুজনে দুজনকে
স্পর্শ করতে পারছিল। মাঝে মধ্যে অনলাইন-এ কথা হতে লাগলো, দুই তিন ঘন্টা যেন কেটে যেত
দুই তিন মিনিটে। তৃষা একবার ভাইরাসকে জিজ্ঞাসা করে, "আচ্ছা, তুই আমার পাল্লায়
পরেছিস না আমি তোর পাল্লায়।"
ভাইরাসের স্পষ্ট উত্তর: যদি বলি দুজনের পাশাপাশি সিট্ পরেছিল !!!
Just bold out" তৃষা, ভাইরাসের কথায়।
এই ভাবে ৫-৬ মাস কেটে যায়। ভাইরাস ছুটিতে কলকাতা আসে, দেখা করে তৃষার সাথে। সেদিনও
গাড়ি নিয়ে দেখা করতে এসেছিল সে । তৃষার চোখের দিকে তাকিয়ে তার মানে হয়েছিল, এই চোখে
চোখ রেখে সারা জীবন কাটিয়ে ফেলা কোনো বাপ্যার-ই না তার কাছে। দুজনেই অদ্ভুত এক উত্তেজনা
ও ভয়ে আড়ষ্ঠ হয়ে ছিল । কথা বলতে বলতে হঠাৎ তৃষার হাত স্পর্শ পেল ভাইরাসের হাতের। কনকনে ঠান্ডা
ছিল তার হাত । তৃষারও একই অবস্থা, ভয়ে ও উত্তেজনায় শীতল হয়ে গেছিল সে । একেই
কি অভিসার বলে ! এর থেকে বরং ভালো ছিল তৃষার অফিস ফেরত সঙ্গি ভাইরাস । কিছুতেই যেন
সাবলীল হতে পারছিল না তারা । দিল্লীতে ফিরে গেল ভাইরাস। আবার শুরু হলো ফোন আর ইন্টারনেট-এ
মনের আদান প্রদান। ১৫০০ মাইল দুরত্ব যেন কোনো বাঁধাই নয়, দখল করে বসে আছে একে অপরের
মন। এর মধ্যেই অতিন্দ্রম একদিন সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেয় তৃষাকে । হোচট খেল তৃষা ।
প্রথমেই মানে পড়ল তার অসুস্থ মায়ের মুখ, সে ছাড়া যে আর কেউ নেই তার। প্রস্তাবটা
খানিকটা এড়িয়ে গেল সে । এর ঠিক দুই মাস পরে,
আবার অতিন্দ্রমের, কলকাতা আগমন, পুজোর ছুটিতে । আবার সেই একসাথে চোখে চোখ । এবার বেশ খানিকটা সাবলীল
যেন হয়ে উঠলো তারা । মিশে যেতে লাগলো স্রোতের ধারায় । সেদিন ভাইরাসের কাছে গাড়ি নেই । ট্যাক্সি উপেক্ষা করে তারা একটা ফাকা বাস দেখে উঠে
পারে । ভাইরাস যেন চোখ সরাতে পারছিলনা না তৃষার দিক থেকে । এতটাই অভিভূত ছিল সে, যে
বাসের বাকি লোকজনদের কথা তার মনেও ছিলনা ।
তারও বেশ উপভোগ করছিল এই তাকিয়ে থাকাটা । ফেরার সময় বেশ একটা মজার ঘটনা ঘটে।
তারা যে বাসটাতে ফিরছিল, সেটা এতটাই ফাকা ছিল যে সবকিছু উপেক্ষা করে অতিন্দ্রম লেডিস
সিটে বসে পরে তৃষার পাশে । আস্তে আস্তে ভির জমতে থাকে বাসে । অন্য লেডিস সিট গুলো যতক্ষণ
খালি ছিল, তাকে কেউই কিছু বলে নি, বরং তাদের দুজনের দৃষ্টি বিনিময়টা সবাই ভালই উপভোগ
করছিল। অবশেষে এক ভদ্র মহিলার কারণে অনিচ্ছা সত্বেও তাকে উঠতে হয়, এবং সে তৃষাকে জিজ্ঞাসাও
করে যে সত্যিই তাকে উঠতে হবে কিনা ! তৃষাও অনিচ্ছার সঙ্গে জানায় যে এটাই বিধিসম্মত
নিয়ম । ঘোরতর অসন্তুষ্ট অতিন্দ্রম, বাস থেকে নেমে তৃষাকে বললো, “তোমাদের কলকাতায় যা
নিয়ম কানুন করে রেখেছ নাঃ, অসহ্য !” নতুন করে যেন কলকাতাকে সহ্য হচ্ছিলনা ভাইরাসের
। কদিন বাদে আবার ফিরে গেল সে নিজের গন্ডির মধ্যে । অতিন্দ্রমের এমন অবস্থা হয়েছিল
যে সারাদিনের ছোট খাটো ঘটনাও সে তৃষার সাথে বিনিময় না করে থাকতে পারত না । আস্তে আস্তে
নির্ভারশীল হয়ে উঠছিল সে তৃষার উপর । যেদিন তার পিসিমা গত হলেন, তখন সে অফিসের কাজে
গুরগাঁও তে । পিসিমা ছিলেন তার বড় কাছের মানুষ । তাই বুঝে উঠতে পারছিল না অতিন্দ্রম,
তার ঠিক কি করা উচিত তখন, সব ফেলে সে ছুটে যাবে পিসিমার কাছে, না অফিসের কাজ শেষ করে
ফিরবে ! নিজের এই গভীর সংকট ও মনের অবস্থা জানাতে সে তৃষাকে অন্তত ২০ বার ফোন করে ।
কিছুতেই পাচ্ছিলনা তৃষার ফোন, অথচ তৃষার কাছে নিজেকে উজার না করলে তো শান্ত হবে
না এই মন ! তৃষার কাছেই একমাত্র তার মনের সব
অবসাদ যেন ডানা মেলে উড়ে যায় মুহুর্তেই । যেদিন মারা গেছিলেন তার মামা, সেদিনও সে হয়েছিল
তৃষার মুখাপেক্ষী । দুরত্ব যেন কোনো বাঁধাই নয়, চাইলেই সে হাত বাড়ালে স্পর্শ করতে পাতে
তৃষাকে । দুজনেই দুজনের প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ বোধ করছিল । সারাদিনে অন্তত একবারের
জন্য তারা নিজেদের মনের অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে থাকত না। সেই সঙ্গে চলতো অল্প বিস্তর খুনসুটিও ।
একদিন কথার মাঝে ভাইরাস তার ছাত্র জীবনের এক মজার গল্প করতে করতে তৃষাকে বলে কি ভাবে ভাইরাসের এক বন্ধু তার
কথা শুনে নিজের বান্ধবীর কাছে চড় খেয়েছিল । বিষয়টা ছিল চাঁদ দেখানো নিয়ে। তর্কের খাতিরে
ভাইরাস তৃষাকে চাঁদ দেখাবার বাজী রাখে, তাও আবার ১৫০০ মাইল দূর থেকে, চাঁদ সে তাকে
দেখাবেই তা সে যে ভাবেই হোক না কেন । বিষয়টা তৃষার মাথায় ঢুকে গেলে, সেও মরিয়া হয়ে
ওঠে ভাইরাসকে হারাবার তাগিদে । সুতরাং তৃষাও ভাইরাসের সাথে ফোনে কথা বলার সময়, বেশ
সংযত থাকত । ভাইরাস তাকে যদি বলতো যে আকাশে চাঁদ উঠেছে কিনা, অথবা আজ কি পূর্নিমা,
ইত্যাদি কথা, তৃষা সবেতেই সচেতনে যেত । কিছুতেই সে তাকাত না চাঁদের দিকে, তথাপি ভাইরাসও
ছাড়বার পত্র নয় । কথার জালে জড়িয়ে একদিন সে তৃষাকে কল্পনার জগতে নিয়ে আসে বিড়লা তারামন্ডল
। ভাইরাস প্রশ্ন করে তৃষাকে, বল এবার কি করবো...!! তৃষা আচমকা কিছু না ভেবেই বলে ফেলে,
আবার কি ! এবার চাঁদ তারা দেখব !!!
ভাইরাস উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো, “দেখলি তৃষা তোকে চাঁদ দেখিয়েই ছাড়লাম !!! হেরে
গেল তৃষা ভাইরাসের কাছে । কিন্তু এই হারেও যেন এক তৃপ্তি আছে । কিন্তু সে জানতনা আরো
বড় এক পরাজয় বসে আছে তার জন্য । যে কোনো সম্পর্কই একটা পরিণতিতে পৌছাতে চায় । আর তাদের
সম্পর্কটাও যে পরিনতি চাইবে সেটাই তো স্বাভাবিক । তবু অতিন্দ্রম যখনি বিয়ের প্রস্তাব
দেয়, তৃষা কথা ঘুরিয়ে চলে যায় অন্য প্রসঙ্গে । ভাইরাস মাঝে মাঝে তৃষাকে বলে তার সাথে
পালিয়ে যেতে । বলে " চল না, দেখবি বেশ একটা অন্য রকমের জীবন হবে আমাদের” ছেলেমানুষী
এই সব কথায় হেসে উড়িয়ে দেয় তৃষা । অথচ ভাইরাস কিন্তু সত্যিই স্বপ্ন দেখত তৃষাকে নিয়ে
ঘর বাঁধবার । তৃষার পক্ষে তার অসুস্থ মাকে ছেড়ে গিয়ে ভাইরাসের সাথে দিল্লীতে থাকা সম্ভব
নয় । আর তার মায়ের দায়ভার সে কেনই বা চাপাবে ভাইরাসের ঘাড়ে । তৃষার মনে হয়েছিল, প্রথম
দিকে অতিন্দ্রম এইসব মেনে নিলেও পরে এই দায়ভার তিক্ততা সৃষ্টি করবে তাদের সম্পর্কে
। অগত্যা তৃষা এড়িয়ে চলতো বিয়ের প্রস্তাব । অন্য দিকে ভাইরাসকে ছাড়া তৃষার জীবনটাও
যেন ছিল অর্থহীন । তৃষার প্রতি অমোঘ আকর্ষণ থাকলেও তার পরিস্থিতি না বোঝার মতন অবুঝ
ও সে নয় । মনে প্রাণে তৃষা তার হলেও কোথাও যেন এক অদৃশ্য দেয়াল আছে তাদের মাঝে, সেটা
সে ভালই অনুভব করছিল । তবু তৃষা যে তার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, তার থেকেও যে মুক্তি
নেই অতিন্দ্রমের । অতিন্দ্রম ঠিক করলো আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কাজে মন দেবে
সে । সাধারনত অফিসে ঢোকার আগে সে সামান্য কথা বলত তৃষার সাথে, যেদিন কোনো কারণে কথা
হত না, সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ফোন করে নিত ।
এরকমই চলছিল, বছর দু-এক। হটাৎ ৩-৪ দিন ফোন আসে না তৃষার কাছে । তৃষা বিভ্রান্ত
হয়ে পড়ে। এমনি এক বিসন্ন দিনে, যেন তৃষার মন বুঝেই FM রেডিওতে গান বেজে ওঠে, “বঁধুয়া
আমার চোখে জল এনেছে হায়, বিনা কারণে,” সাধারণত তৃষা কখনই ভাইরাস কে ফোন করত না, ফোনের
ব্যাপারে ভাইরাসই অগ্রণী ভূমিকে নিত প্রথম থেকে । কিন্তু তৃষা যখন আর থাকতে পারত না,
তখনই সে একটা মর্মস্পর্শী SMS পাঠাত, তার গলা শোনবার জন্য । সুতরাং ৩-৪ দিন ভাইরাসের
গলা না শুনে থাকাটা তার কাছে হয়ে ওঠে এক চরম শাস্তি । তৃষা আর থাকতে নে পেরে ফোন করে
: ফোন ওঠায় না ভাইরাস । একটু পারে SMS, "বসের সাথে বসে আছি, পরে ফোন করছি"
, কিন্তু ফোন আসে না সারাদিনেও । পরের দিন সকালে আর থাকতে না পেরে তৃষা তার mail
box এ লিখে পাঠায় "বঁধুয়া আমার চোখে জল এনেছে বিনা কারণে, আমিও খুঁজি কারণ, মন
আমার করে বারণ, বলে কেন এমন মরণ বিনা কারণে,"
সন্ধ্যে বেলা কাজের ফাঁকে লেখাটা চোখে পরে অতিন্দ্রমের, তৃষার চোখে জল, নিজেকে
দোষী মনে হয় তার, থাকতে না পেরে ফোন করে তৃষার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সে । সে অনুভব
করে, যে গত দিনের ফোন না করার পিছনে যে সমস্ত কারণ সে বলেছে, তার একটাও বিশ্বাস যোগ্য
নয় তৃষার কাছে । কিন্তু কি বা করার আছে তার, তৃষাকে পাবার যে আকাঙ্খা তার মনের মধ্যে
ডালপালা ছড়িয়েছিল, এই পরিস্থিতিতে তা কোনো মতেই সম্ভব নয় তৃষার দিক থেকে, তাই সে নিজেকে
গোটাতে শুরু করেছে । আগে রবিবারের সকালগুলোতে ঘুম থেকে উঠেই বেশ খানিকটা জমিয়ে আড্ডা
চলত তৃষার সাথে । তৃষাও বসে থাকত এই সময়টার জন্য । কিন্তু এখন তৃষার বৃত্ত থেকে বের
হবার জন্যই, বিশেষ করে রবিবারের দিনগুলোতে সে তার অফিসের অথবা মেসের বন্ধুদের সাথে
বেড়াতে শুরু করলো, দিল্লী শহর ও আসেপাশের জায়গা । খানিকটা কমতে লাগলো তৃষার প্রতি তার
টানের পারদ মাত্রা।
অপরদিকে তৃষার অবস্থা ক্রমশ শোচনীয়, রবিবারের দিন গুলোতে, ভাইরাস তার পিছু ছাড়ত
না যেন । কিন্তু, কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে সব । খুবই অবাক হয়েছিল তৃষা, দশমীর দিনে ।
সারাদিনে ভাইরাসের থেকে না এল কোনো ফোন, না এলো SMS, এমন টা তো গত তিন বছরে একদিনও
হয় নি । বিকেল বেলায় তৃষা যখন ফোনে ধরল তাকে, ভাইরাসের মুখে ছিল অফিসের অজুহাত । বিজয়া
দশমীর দিন, সারা ভারতবর্ষ ছুটি থাকে, অথচ, সে তাকে মিথ্যে কথা বলল !!! তৃষা বুঝতে পারে
কোথায় যেন চির ধরেছে তাদের মধ্যে। কোনো এক ববিবার, তৃষা কোনো কারণে ফোনটা ধরতে পারে
না অতিন্দ্রমের, যথারীতি তৃষা তার ফোনে missed call দেখে ফোন করে অতিন্দ্রমকে । ভাইরাসের
ফোন ব্যাস্ত । সাধারণত, এইরকম সময়, দু এক মিনিটের মধ্যেই পাল্টা ফোন আসে ভাইরাসের ।
কিন্তু সেদিনই ঘটল প্রথম ব্যতিক্রম। দু ঘন্টাতেও ফোন এলো না অতিন্দ্রমের । অবশেষে তৃষা
যখন আবার ফোন করে, ভাইরাস বলে ওঠে, কি করবো; তুমিই তো ধরলেনা ফোনটা ", বড় দায়সারা
গোছের একটি কথা । থমকে দাড়ায় তৃষা। রেখে দেয় সে ফোন । ততক্ষনাত আবার ফোন ভাইরাসের,
"ফোনটা কেটে দিলি যে বড় ! তুই কি জানিস না এই ফোন কেটে দেওয়া আর আমার একটা শিরা
কেটে ফেলা, আমায় একই যন্ত্রনা দেয় । খবরদার, আমার ফোন কাটবি না কখনো, বলে দিলাম । ঝগড়া
কর, রাগ কর, চেঁচামেচি কর, সব সহ্য করে নেব, কিন্তু ফোন রেখে দিস না please. কি বলবে
তৃষা, বুঝতে পারে না । এই মানুষটাকে কি অবিশ্বাস করা যায় ............
কিন্তু ছোট ছোট ঘটনা, বার বার তৃষাকে জানান দিচ্ছিল যে তার প্রতি অতিন্দ্রমের অমোঘ
আকর্ষণ ধীরে ধীরে পিছু হাটছে ক্রমশ । যেখানে শুধু মনের ভালো লাগাকে সতন্ত্র করে একটা
সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেখানে অন্য কোনো জোর খাটে না । তাই তৃষা নিজেকে শক্ত করতে শুরু করে
। মনকে বোঝানোর চেষ্টা করে হয়ত তৃতীয় কোনো ব্যক্তির প্রবেশ ঘটেছে তাদের মাঝে । একই
সঙ্গে ভাইরাসকে সন্দেহ করতেও ভীসন কষ্ট হয় তৃষার ।
বিভ্রান্ত মনকে শান্ত করতে সঞ্চয়িতা খুলে বসে সে। তার প্রিয় কবিতা, “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ
", খুলতেই মনে পরে গেল সেই দিনের কথা,
চার মাস পরে,যেদিন তাদের দেখা হয়েছিল আবার, স্বপ্নের মতন ছিল দিনটা । সবে সূর্য
অস্ত গেছে, তারা পাশাপাশি বসে, সামনে দীগন্ত জলাশয়, তার কন্ঠে "নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ”চারিদিকের
নিস্তব্ধতা টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ ।
আর পারলোনা তৃষা । বইটা বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাড়ায় সে । মাথার উপর দিয়ে উড়ে
গেল একটা প্লেন, বুকের ভিতর কাপিয়ে । ফ্ল্যাশ ব্যাকে মানে পরে গেল, পাঁচ মাস পরে, ছুটি
পেয়ে কলকাতায় এসেছিল যখন ভাইরাস, সেবার তাদের দেখা হয় নি । ফেরার সময়, প্রতিবারের মতন
এয়ারপোর্ট এ পৌঁছে SMS করে সে । তৃষার সাথে দেখা না হওয়া মন বড় ভারাক্রান্ত ছিল তখন,
যা ফুটে উঠেছিল SMS এ, ভোর সাড়ে চারটের সময় । ভোর বেলায় খোলা ছাদে মাথার উপর দিয়ে উড়ে
গেছিল অতিন্দ্রমের প্লেন, তৃষার মনের মধ্যে লেগেছিল তার আবেশ, যেন ভাইরাস ই উড়ে গেল
ওই প্লেনে, দিল্লীর দিকে । অদ্ভুত এক অনুভুতি হয়েছিল তার । গলার কাছে কুন্ডুলি পাকিয়ে
উঠে আসছিল এক কান্না । চুপ করে দাড়িয়ে ছিল সে
মাথার উপর দিয়ে প্রিয় জনের উড়ে চলে যাওয়ার এক আশ্চর্য্য অনুভুতি জানান দিল তৃষাকে
। কি করে ভুলে যাবে তৃষা, ভাইরাসকে ! সে যে ছড়িয়ে আছে তার শিরায় শিরায়, ধমনীতে । ভাইরাস
তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে, প্রতিদিন । অফিস থেকে ফেরার পথে আর ফোন আসে না তার, রাতের ফোন ও
বন্ধ হয়ে গেল আচমকা, তবু সে পারে না ভাইরাসের উপর রাগ করে থাকতে ।
তৃষা বিশ্লেষণ করছিল তাদের সম্পর্কের গভীরতা । আজও বুঝে উঠতে পারেনি অতিন্দ্রমকে
। কখনো কখনো মনে হয় ভাঙ্গন বুঝি এল এইবারে । আবার কখনো কখনো ভেসে যায় তার কথায়, ভুলে
যায় সব । তবে এটা বুঝতে পারছিল যে তাদের সম্পর্কের মধ্যে এক বিরাট সংযম ও দুরত্ত জায়গা
করে নিয়েছে আস্তে আস্তে । যে কোনো সম্পর্কই একটা পরিনতি চায়, কিন্তু অসুস্থ মা তার
যে বড় পিছুটান । মা কে বাদ দিয়ে তৃষা যে ভাসবে জীবন সমুদ্রে, তাও তো সম্ভব নয় । আর
ভাইরাসই বা কদিন অপেক্ষা করে থাকবে তৃষার জন্যে …! আর ভাবতে পারে না তৃষা, সব কিছু
ছেড়ে দিয়েছে নিয়তির হাতে। ঝড় যেমন ওঠে, তেমনি ঝড়ের হাত থেকে বাঁচার রাস্তাও তৈরি হয়ে
যায় । তৃষা, অতিন্দ্রমের হাতের পুতুল মাত্র। তবে এটাও ঠিক যে সে না এলে তৃষা নিজেকে
নতুন করে চিনতে পারত না ।
তাই আর ভাবে না সে । ধীরে ধীরে তৃষাও সংযমী হয়ে ওঠে, আজকাল আর ভাসতে চায় না সে
। আগের মতন আর রোজ দিনে দুই তিনবার কথা হয় না অতিন্দ্রমের সাথে, দীর্ঘ
কথোপকথন কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, তবু মাঝে মাঝে
অতিন্দ্রম তৃষাকে মানে করিয়ে দেয় আজ সে তৃষার প্রতিক্ষায় । এখনো ভালোবাসে সে তৃষাকে
। তৃষা সব শুনে যায়, আর ভাবে সত্যিই কি কেউ অপেক্ষা করে কারুর জন্য, এক মাত্র সময়ই
তা বলে দিতে পারে । সে ছেড়ে দিয়েছে সময়ের হাতে সব কিছু । অতিন্দ্রমের সমান্তরাল কোনো
ঢেউ আর ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারবেনা কোনদিন তৃষাকে। তৃষা যে একমাত্র তার কাছেই সমর্পণ
করেছিল নিজের সবকিছু। আজ বহুদূরে তারা, দুই সীমান্তে। তবু যেন ক্ষীন এক আশার আলোক বিন্দু,
"অপেক্ষা ", সত্যিই যদি অপেক্ষা করে ভাইরাস সেইদিন পর্যন্ত, শুধু তৃষারই
জন্য, যেদিন মুক্তি পাবে সে নিজে, মুক্তি পাবে তার যত পিছুটান ।
আমরাও অপেক্ষা করবো সেই দিনের জন্য, যেদিন তৃষা, অতিন্দ্র্মের হাত ধরে এগিয়ে যাবে
নতুন আলোর দেশে, তারা মিলেমিশে হবে সৃষ্টি তত্তের নতুন এক পথিক, আমরা অপেক্ষা করবো
তাদেরই জন্য ।
তবু তৃষার মনের ভিতর বেজে চলে অবিরাম, এক সুর:
কখনো আমি যা খুশি তাই,
কখনো আমি তোর বরণে,
নিজেকেই নিজে খুঁজে বেড়াই
হে বন্ধু : শুধু তোর-ই কারণে

গল্প টা পড়তে পড়তে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম । ভীষণ মিষ্টি সুরে বেশ চলছিলো কিন্তু ভালবাসা যে এমন ই । চড়াই উতরাই থাকেই । সম্পর্ক গুলো কি দিনে দিনে একঘেয়েমিতাই চলে আসে ? জানি না । তবু ও কোথায় যেন গতি হীন হয়ে যায় চলতে চলতে । ভীষণ জীবনমুখী একটি লেখা বন্ধু । ভালো লাগলো
ReplyDeleteভাললাগল গল্পটি.....নিরেট ভালবাসার কথা মনটা ছুঁলো......
ReplyDeletetrisha r atindrom sukhi hok...
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো গল্পটি ...এটাই এখনকার ভালোবাসা ...যুগোপযোগী লেখা ।।
ReplyDeletebes laglo Sudesna. aro kichu porbar dabi korchi .
ReplyDeleteপড়তে পড়তে ডুবে গিয়েছিলাম ভালবাসার সমুদ্রে।।
ReplyDeleteভালবাসার জোয়াড়েই মানুষ আশা নিয়ে ভাসে।।
দুরদান্ত লিখেছ।।মন ভরে গেল।।
পড়তে পড়তে ডুবে গিয়েছিলাম ভালবাসার সমুদ্রে।।
ReplyDeleteভালবাসার জোয়াড়েই মানুষ ভাসে আশা নিয়ে।।
দুর্দান্ত লিখেছ।।মন ভরে গেল।।
মন ভরে গেল ...ঝরঝরে সুন্দর টানটান লেখা... এমন আরও অনবদ্য লেখার অপেক্ষায় রইলাম।।
ReplyDelete