দীপক রায়


লেখা শুরু প্রথম ৩১ শে আগষ্ট শহীদ দিবসে খাদ্য আন্দোলনের শহীদ নুরুল ইসলাম কে জেনে ১৯৮৪ সালে, কলেজের ওয়াল ম্যাগাজিনে প্রকাশ পায় সে লেখা, তারপর কর্মজীবনে লেখা হইয়নি কিছু । এরপর নাট্যদলে যোগদান, ডাইরী লেখা, নতুন করে লেখার শুরু ২০১৩ সালে ।

"মনের কোণে নিজের কলমে", কলম ধরি মাঝে মাঝে । ভালো লাগে এই গ্রুপটির সামগ্রিক চেতনা ও উন্মেষ । আশা রাখি শীর্ষ তম সাফল্যের ।

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

কাঁচাসোনা

কেমন আছিস ? এক নদী রাত্রি পেরিয়ে, দুই পাহাড় দিন ডিঙিয়ে , তিন জঙ্গল দুপুর আর চার বিল-ঝিল-জলা বিকেল হারিয়ে - আমি এখন অচিনপুরের খোঁজে , হৃদনগর ষ্টেশনে ১ নং প্লাটফর্মের টিকিট কাউন্টারে আপ ট্রেনের সময় সারণীতে চোখ বোলাই, ডাউন ট্রেন আসে পরপর, কাঙ্ক্ষিত আপ ট্রেন আসেনা আর...

অনুভব ডাইরির পাতায় চিঠি লেখার ব্যস্ততায় খেয়াল করেনি – কখন আনমনা বিকেল সন্ধ্যার হাতে রিলে রেসের ব্যটম ধরিয়ে, ট্রাকের বাইরে দাঁড়িয়ে, ফিনিসিং লাইনে রাতের স্প্রিন্ট দৌড় দেখার আশ নিয়ে, ক্লান্ত দেহে সবুজ ঘাসে এলিয়ে পড়েছে । আধপাগলা ভিখিরি রোজকার মত চাঁদের মোহমায়ায় ভেসে গান ধরেছে – “এই কি গো শেষদান / বিরহ দিয়ে গেলে / এই কি গো....” । অনেকক্ষন পর একটা আপ ট্রেনের ঘোষণা...
সারা শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ, বোধহয় আজ এই ট্রেনে মানসী ফিরবে, মনে হ’তেই অনুভব পাগলের মতো দিক্‌শুন্য হয়ে, নেমে পড়ল রেল লাইনের ওপর, ২ নং প্লাটফর্মের ব্রিজের থামের আড়ালে পৌছনোর তাড়ায় ডাউন ট্রেন ঢুকছে খেয়াল করেনি। থামের আড়াল থেকেই ও মানসীকে দেখে যখন ও ফেরে অভিসার সেরে । “ ট্রেন আসছে – ট্রেন আসছে – আপনি কি করছেন কি” – আধপাগলা ভিখিরির চিৎকারে সম্বিত ফিরেই অনুভব দেখল ট্রেন টা প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়েছে । লাফ মেরে পেরোতে গিয়ে সোজা গিয়ে পড়ল গিয়ে দুই লাইনের মাঝের সরু বাঁধানো নালায়। কাধেঁর ঝোলা ছিটকে নালায় ...
হাত সামান্য ছঁড়ে গেছে, কিন্তু ব্যাগ ভিজে চুপচুপ । মানসীর দেওয়া শুকনো ঝুরঝুরে গোলাপ টার দফারফা শেষ । মানসীর রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি ওই গোলাপটা এতদিন সযত্নে লালন প্রক্রিয়ায় ছেদ টানল ...। আপ ট্রেন থেকে খুব অল্প লোকই নামলো । থামের আড়ালে দুরুদুরু বুকে অনুভব আর ট্রেন থেকে নামা প্রতিটা মুখ একে একে ওর কাদামাখা অবস্থায় ব্যাঙ্গের চাবুক মারতে মারতে এগিয়ে গেল – হঠাৎ সেই কালো ছেলেটার হাত ধরে লাজুক হাসির আদর মাখা মুখে - মানসী লাল শাড়ীতে - চঞ্চল হরিণীর সেই কাজল কালি চোখে এসে দাঁড়ালো ব্রিজের নীচে ।

- এবার যাও, কেউ দেখে ফেলবে ।
- দেখুক না, দেখলেই তো ভালো, কলঙ্কিনী রাধা – আজীবন এই বাহুডারে পড়বে বাঁধা । কালো ছেলেটা কাব্য করে উত্তর দিলো । মানসীর চপল হাসির ঝরনায় চাঁদ মুখ লুকালো মেঘ ঘোমটার আড়ালে ।
- - না এবার যাও – প্লীজ ।
- গাল বাড়ালাম লজ্জা এঁকে দিয়ে যাও, না দিলে বাড়ী পর্যন্ত ধাওয়া করবো, ভেবে দেখো কি করবে ।
- ইসস্‌ , কত শখ, এখন এখানে, পাগল হ্যাংলা কোথাকার ।
- দেবে কি না বলো ?
এদিক ওদিক সন্তপর্ণে তাকিয়ে মানসী রাঙিয়ে দিল কালো ছেলেটার গাল। অনুভব থামের আড়ালে থিরিথিরি কাঁপে – দফারফা হ’য়ে যাওয়া শুকনো সেই ঝুরঝুরে ভিজে চুপচুপ গোলাপ টা মাখামাখি কালো ছেলেটা আর মানসীর গায়ে । মানসী চমকে উঠে বললো “প্লীজ – আবার কাল দেখা হবে –
যাওও... গোলাপের ফসিল পাপড়ি গুলো কি অনুভবের কথা মনে করালো মানসীকে ।। অনুভব ভাবনায় হারালো ।

লাল আঁচল উড়িয়ে কালবৈশাখী এল...... ধুলো আবডালে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল মানসী ।

আবার চিঠি লেখায় মন দিল অনুভব – এ চিঠি যে করে হোক পৌঁছে দিতে হবে মানসীকে ।

আজ আপ ট্রেন এসেছিলো, এসেছিলি তুই, থামের আড়ালে জমাট পাথর হ’য়ে দেখলাম তোর প্রিয়তম কে, ও সেই মাখনচোরা নন্দকিশোর রাখাল, ওর বাঁশীতে আজও সুর, তোদের দুজনকে মানিয়েছে বেশ ।
না ! আর হৃদনগরে আসবোনা, কথা দিয়ে গেলুম আজ, ভাল থাকিস অভিসারিকা, আমার মানসী আর নেই, নেই সেই লাল শাড়ী আর জুলাই দুপুর , নেই সেই আকুল আকুতি “ একবার আসবি বড় একা লাগছে”।

ডাইরির পাতাটা এক টানে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে উড়িয়ে দিল কালবৈশাখীর প্রবহমান স্রোতে......।।

আধপাগলা ভিখিরি গান ধরলো – “ তারে ধরি ধরি মনে করি / ধরতে গেলে আর পেলেম না / দেখেছি রূপ সাগরে মনের মানুষ / কাঁচাসোনা...” .

5 comments:

  1. বেশ হয়েছে গল্পটি......শুভেচ্ছা রইল

    ReplyDelete
  2. ছোট্ট ছোট্ট ঘটনা সত্যি যেৃ হৃদয়কে নারা দিয়ে যায়
    এই কাঁচাসোনা বুকে আচর কেটে দিল ............ভাল থাকুন আর আরও আরও লিখা
    পড়তে চাই !!

    ReplyDelete
  3. hmmm..onubhobder ki emoni hote hoi???

    ReplyDelete
  4. সত্যি অনবদ্য...কবিগুরুর ভাষায়...''শেষ হয়েও হইল না শেষ।।''
    মনে বেশ দাগ কেটে দিল।।শুভেচ্ছা অফুরন্ত।।

    ReplyDelete